
বারো হাত কাঁকুড়ের তেরো হাত বিঁচিঃ ‘রাধিকাপূরাণ’ নিয়ে যত ব্যাকরণ (কবি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের ছন্দালোচনার উত্তরে)
তুষার গায়েন
Share
Tuesday, June 2, 2009 at 3:17pm
কবি শাহানা আকতার মহুয়ার একটি ছোট্ট কবিতা ‘রাধিকাপূরাণ’ নিয়ে অনেক আলোচনা হয়ে গেল। যেন ‘বারো হাত কাঁকুড়ের তেরো হাত বিঁচি’, এইরকম দশা!এই আলোচনা আর প্রলম্বিত করার করার ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু আমি নাচার। আলোচনা উঠলে তাকে তো একটা যৌক্তিক পর্যায়ে এনে শেষ করতে হবে! এক্ষেত্রে কারো কটূ-কাটব্য, শ্লেষ ও ব্যক্তিগত আক্রমন গ্রহনযোগ্য নয়। যে-কোনো বিষয় নিয়েই আলোচনার পথ খুলতে পারে, শুধু তাকে সুস্থতার মধ্যে ধরে রাখতে হবে, এটাই হোক অঙ্গীকার।
সুব্রতদা বলেছেন যে “বাংলা ছন্দের কোনো ইউনিট যুক্তাক্ষর বা অযুক্তাক্ষর না, বরং রুদ্ধ এবং মুক্ত অক্ষর (Syllable)”। তিনি কি ‘মুক্ত-অক্ষর’ ও ‘রুদ্ধ-অক্ষর’ বলতে ‘মুক্ত সিলেবল্’ (Open syllable) ও ‘রুদ্ধ সিলেব্ল্’ বুঝিয়েছেন? কারণ এর ব্যাখা দিতে গিয়ে তিনি যে উদাহরণ টেনেছেন, তা হচ্ছে সিলেব্লের ধারণা। কিন্তু ‘মুক্ত-অক্ষর’ ও ‘রুদ্ধ-অক্ষর’বলতে কি কিছু হয়, না তা হয় ‘মুক্ত সিলেবল্’ও ‘রুদ্ধ সিলেবল্’-র বাংলা প্রতিশব্দ? সিলেব্লের বাংলা প্রতিশব্দ কি? কবি ও ছান্দসিক নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী তাঁর ‘কবিতার ক্লাস’-এ (ছন্দের সরল পাঠ হিসেবে যে বইয়ের কোনো জুড়ি নেই)বলেছেনঃ “সিলেব্ল্-এর বাংলা প্রতিশব্দ কী করব? সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত করেছিলেন ‘শব্দ-পাপড়ি’; কালিদাশ রায় করেছেন ‘পদাংশ’; প্রবোধচন্দ্র দল’এর পক্ষপাতী। অনুমান করতে পারি, সত্যেন্দ্রনাথ ও প্রবোধচন্দ্র শব্দকে পুষ্প হিসেবে দেখেছেন; সিলেব্ল্ তার পাপড়ি কিংবা দল। ... এক কথায় বলতে পারি, কোনও-কিছু উচ্চারণ করতে গিয়ে নূন্যতম চেষ্টায় যেটুকু আমরা বলতে পারি, তাই হচ্ছে সিলেবল। সেই দিক থেকে এক-একটি সিলেব্ল্ হচ্ছে আমাদের উচ্চারণের এক-একটি ইউনিট কিংবা একক।... ধরা যাক, ‘কবিকঙ্কণ’ শব্দটাকে আমরা উচ্চারণ করতে চাই।... ক+বি+কং+কণ্, অর্থাৎ শব্দটি মোট চারটি সিলেবল্-এর সমবায়ে গড়ে উঠেছে।’’ (কবিতার ক্লাস, পৃষ্ঠা৭৮)
এর ভেতর প্রথম দুটো মুক্ত সিলেবল্ ও শেষের দুটো রুদ্ধ সিলেবল্। দেখাই যাচ্ছে যে, সিলেবল্ যেহেতু এক বা একাধিক অক্ষরের সমবায়, তাই মুক্ত ও রুদ্ধ-অক্ষর বললে এর চারিত্র্য প্রকাশ পায় না। কেননা, ‘রুদ্ধ-অক্ষর’ তো যে-কোনো একটি অক্ষর নয়, বরং অক্ষর-সমবায় (শব্দ-পাপড়ি/ পদাংশ/দল)।
সবাই অবগত আছেন যে, বাংলা কবিতার প্রধান তিনটি ছন্দঃ অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত ও স্বরবৃত্ত।ছন্দ বোঝার ক্ষেত্রে রীতিসিদ্ধ ব্যাকরণের পথ ও পরিভাষার ব্যবহার নবীন কবি, সাহিত্যের ছাত্র ও সাধারণ পাঠকের জন্য আনন্দের পরিবর্তে সচরাচর বিরাগের কারণ হয় বলে, নীরেন্দ্রনাথ এর সরল বিকল্প হিসেবে প্রথম দুটি ছন্দ অক্ষরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্ত নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে, অক্ষর ও যুক্তাক্ষরকে মাত্রা গণনার একক (unit) হিসেবে উপস্থাপন করেন।পাশাপাশি এর সীমাবদ্ধতা এবং ধ্বনির সঙ্গে অক্ষরের স্পর্শকাতর সম্পর্ক নিয়েও সচেতন থাকার কথা বলেন। উদ্ধৃতিঃ “ধ্বনিটাই অবশ্য প্রধান কথা, অক্ষর নেহাতই গৌন ব্যাপার। ... তবু, প্রথম দুটি ছন্দের ক্ষেত্রে অক্ষরও একেবারে ন-গণ্য নয়। ব্যতিক্রমের কথা যদি ছেড়ে দিই, তবে অক্ষরের ভিত্তিতেও মাত্রার একটা মোটামুটি হিসেব সেখানে রাখা চলে। স্বরবৃত্তে সেটা একেবারেই চলে না। একই শব্দ যে এই তিন রকমের ছন্দে কীভাবে তিন-রকমের মাত্রামূল্য পায়, কবিকঙ্কনের ‘কঙ্কণ’ দিয়েই সেটা বুঝিয়ে দেওয়া যেতে পারে।
(১) অক্ষরবৃত্তে সাধারণত প্রতিটি অক্ষরই একটি করে মাত্রার মূল্য পায়। সুতরাং ‘কঙ্কণ’ সেখানে ৩-মাত্রার শব্দ।
(২) মাত্রাবৃত্তে আমরা সাধারণত প্রতিটি অক্ষরকে একটি করে মাত্রার মূল্য দিই, কিন্তু শব্দের মধ্যস্থ কিংবা প্রান্তবর্তী যুক্তাক্ষরকে (যদি না সেই যুক্তাক্ষরের ঠিক পূর্ববর্তী বর্ণটি হসবর্ণ) দিই ২-মাত্রার মূল্য। সুতরাং ‘কঙ্কণ’ সেখানে ৪-মাত্রার শব্দ।
(৩) স্বরবৃত্তে আমরা প্রতিটি সিলেবল্কে একটি করে মাত্রার মূল্য দিই, এবং ‘কঙ্কণ’ শব্দটিতে মোট দুটি সিলেব্ল্ (কং+কণ্) পাওয়া যাচ্ছে। সুতরাং ‘কঙ্কণ’ সেখানে ২-মাত্রার শব্দ। (কবিতার ক্লাস, পৃষ্ঠা ৮০)
ছন্দ নিয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথও‘যুক্তাক্ষর’ নামক শব্দবিধি ব্যবহার করেছেন, যার উল্লেখ নীরেন্দ্রনাথ তাঁর এ বইয়েই করেছেন।... ‘মানসীর’ ভূমিকায় রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, “আমার রচনার এই পর্বেই যুক্ত অক্ষরকে পূর্ণমূল্য দিয়ে ছন্দকে নূতন শক্তি দিতে পেরেছি।’’ (কবিতার ক্লাস, পৃষ্ঠা ৫৮)
বাংলা যে-কোনো ছন্দ বিশ্লেষনের ক্ষেত্রে, শেষ বিচারে সিলেবল্ই মোক্ষম ও ব্যাকরণসিদ্ধ, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই, এবং নীরেন্দ্রনাথ তা করে দেখিয়েছেন তাঁর এ বইয়ে (সব ছন্দই কি সিলেবিক, পৃষ্ঠা ৯৪)। কিন্তু অন্যথাও যে হতে পারে উপরের আলোচনা তারই উদাহরণ।
সুব্রতদা সিলেব্ল্-এর ব্যাখা দিতে গিয়ে ‘সাধারণ নিয়ম’ বলতে কী বুঝাতে চেয়েছেন, তা বোধগম্য নয়। ‘সাধারণ নিয়ম’ বলতে যা বুঝিয়েছেন তা হচ্ছে মাত্রাবৃত্তের হিসাব।
অত্যন্ত = অত্(রুদ্ধ সিলেব্ল্)তন্(রুদ্ধ সিলেব্ল্)তো(মুক্ত সিলেব্ল্) = ২+২+১= ৫
এটা শুধু অক্ষরবৃত্তেই নয়, স্বরবৃত্তেও হবে ৩ মাত্রা। স্বরবৃত্তে যে-কোন সিলেব্ল্ই, রুদ্ধ কী মুক্ত, এক মাত্রার মূল্য পায়। যাই হোক, সিলেব্ল্ ব্যবহার করে যদি ‘রাধিকাপূরান’-এর বহুল আলোচিত ‘কৃষ্ণের উষ্ণ বুকে’ বিশ্লেষন করি, তাহলে অক্ষরবৃত্তের নিয়মে দাঁড়াবেঃ
কৃষ্ণের= কৃষ্(রুদ্ধ সিলেব্ল্)+ নের্(রুদ্ধ সিলেব্ল্)= ১+২= ৩ মাত্রা
উষ্ণ= উষ্(রুদ্ধ সিলেব্ল্)+ নো(মুক্ত সিলেব্ল্)= ১+১ = ২ মাত্রা
‘উৎসুক’ শব্দকে এভাবে বিশ্লেষন করে দেখানো যেতে পারে যে, তা-ও কোনভাবেই তিন মাত্রার বেশী নয়।
আমি বুঝি না, এক্ষেত্রে ছন্দ-দক্ষ ও ছন্দ-অদক্ষ কবির ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন লাইসেন্স কিভাবে প্রযোজ্য হতে পারে?
মূল নোটটি পড়তে নিচের লিঙ্ক ক্লিক করুনঃ
http://www.facebook.com/profile.php?id=1482225454#/note.php?note_id=80303980417&ref=mf

No comments:
Post a Comment